মঙ্গলবার, ২১ মে ২০২৪, ০৬:৫০ অপরাহ্ন

ব্রেকিং নিউজ :
প্রতিনিধি আবশ্যক, অনলাইন পত্রিকা আমার সুরমা ডটকমের জন্য প্রতিনিধি নিয়োগ দেয়া হবে। আগ্রহীরা যোগাযোগ করুন : ০১৭১৮-৬৮১২৮১, ০১৬২৫-৬২৭৬৪৩

ব্ল-হোয়েল গেম: আতঙ্ক নয় সতর্ক হচ্ছেন অভিভাবকরা

যথাযথ ব্যবস্থা নিতে বিটিআরসিসহ সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

আমার সুরমা ডটকম ডেস্কপপকর্ন কার্নিভাল নামের একটি গোপন লিঙ্কের মাধ্যমে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে প্রাণঘাতী ব্ল-হোয়েল গেম। এমনকি ভারতের কান্টি কোড ব্যবহার করে একটি নম্বর থেকে এই লিঙ্ক ছড়ানো হচ্ছে বলে দাবি করছেন অনেক ফেসবুক ব্যবহারকারী। বাংলাদেশে এ বিষয়ে ফেসবুক সতর্কবার্তা ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই নিজ নিজ বন্ধুদের বিশেষ বার্তা পাঠাচ্ছেন। সাবধান, বাংলাদেশেও পৌঁছে গেছে ব্ল-হোয়েল গেম। এ নিয়ে অনেকেই বিভ্রান্ত হচ্ছেন আবার অনেকে কৌতূহল থেকে জানতে চাইছেন পুরো ব্যাপারটা। কেউ কেউ আতঙ্কও ছড়াচ্ছেন। তবে অভিভাবকরা উঠতি বয়সের ছেলে-মেয়েদের স্মাট ফোন ব্যবহার করার বিষয়ে সর্তক দৃষ্টি রাখছেন। এ জন্য আতঙ্কিত না হয়ে সকলকে সতর্ক অবশ্যই থাকা উচিত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উঠতি বয়সীদের দিকে খেয়াল রাখা, দেখি কী হয়-এর কৌতূহল অনেক সময়ই যাদের নিয়ে যায় ভুল পথে। এ কারণে সচেতনতা বেশি জরুরি। ভুল তথ্য প্রচার বা গুজব রটানো উল্টো এই গেমটির প্রচারণায় বেশি সাহায্য করবে। ফলে, সঠিক তথ্য জেনে রাখাটাই বেশি দরকার। গতকাল সোমবার সচিবালয়ে নিজ দফতরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেছেন, নির্ঘাত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া অনলাইনভিত্তিক গেম ব্ল-হোয়েল’র বিষয়ে খোঁজ-খবর নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)সহ সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। রাজধানীর মালিবাগের বাসিন্দা সোহরা আক্তার গতকাল দৈনিক ইনকিলাবকে বলেন, আমার এক ছেলে ও এক মেয়ে নগরীর নামকরা একটি স্কুলের অষ্টম ও নবম শ্রেনীর ছাত্র-ছাত্রী। ব্ল-হোয়েল গেম সম্পর্কে গত কয়েকদিন ধরেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন ভাবে আলোচনা হচ্ছে। এরই মধ্যে এ গেমটি খেলে ঢাকায় একটি মেয়ে আত্মহত্যা করেছে বলে সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। এর পর থেকে ছেলে-মেয়েদের স্মাট ফোন ব্যবহার এবং কম্পিউটারে কি ধরনের গেম খেলে সে বিষয়ে অধিক নজরদারী করার চেষ্টা করছি। পাশাপাশি আমরা (স্বামী-স্ত্রী) এ বিষয়টি নিয়ে তাদের সাথে কথাও বলেছি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অন্যান্য অভিভাবদের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এ বিষয়ে সকল অভিভাবকদের সর্তক হওয়া প্রয়োজন বলে সোহরা আক্তার মন্তব্য করেন। সূত্র জানায়, সোশ্যাল মিডিয়া নির্ভর এই গেমের বলি হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অসংখ্য মেধাবী তরুণ-তরুণী। গত দু’মাস ধরে ভারতজুড়ে চলছে ব্ল-হোয়েল আতঙ্ক। এবার ব্ল-হোয়েল গেমের শিকার রাজধানী ঢাকার সেন্ট্রাল রোডের এক কিশোরী। গত বৃহস্পতিবার সকালে ওই কিশোরীর লাশ উদ্ধার করা হয় তার পড়ার কক্ষ থেকে। সে ছিল তুখোড় মেধাবী। স্কুলের ফার্স্ট গার্ল হিসেবেই পরিচিত ছিল সে। তার বয়স ছিল মাত্র তেরো। পড়ছিল অষ্টম শ্রেণিতে। পড়াশোনার জন্য সে ব্যবহার শুরু করে ইন্টারনেট। কয়েক বছর আগে থেকেই এনড্রয়েড মোবাইল ফোনও ব্যবহার শুরু করে সে। ফেসবুকসহ স্যোশাল মিডিয়া ব্যবহার চলছিল। এরই মধ্যে সবার অজান্তে সে ঢুকে পড়ে ইন্টারনেটের এক নিষিদ্ধ গেমসে। নিহত কিশোরীর পিতার সন্দেহ, তার আদরের মেয়ে ঢুকে পড়েছিল ইন্টারনেটভিত্তিক ডেথ গেমস ব্ল-হোয়েলে। গত বুধবার দিবাগত শেষ রাতে সে নিজের পড়ার কক্ষে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে আত্মহত্যা করে। পরদিন বৃহস্পতিবার ফ্যানের সঙ্গে ঝোলানো মৃতদেহ উদ্ধার করা হয় নিউ মার্কেট থানাধীন সেন্ট্রাল রোডের বাসা থেকে। ব্ল-হোয়েলের কিউরেটরের নির্দেশ মতো লিখে যাওয়া একটি চিরকূটও উদ্ধার করা হয়। তা এখন পুলিশের হাতে। তাতে বড় করে লেখা, আমার আত্মহত্যার জন্য কেউ দায়ী নয়। লেখা শেষে গেমসের নির্দেশনা মতো একটি হাসির চিহ্ন আঁকা। নিহত কিশোরীর বাবা বলেন, তার মেয়ে কয়েক বছর ধরে কম্পিউটার ও এনড্রয়েড মোবাইল ব্যবহার করছিল। প্যারা, রচনাসহ বিভিন্ন বিষয় ডাউনলোড করে পড়তো। ব্যবহার করতো ফেসবুক। কিছুদিন আগে আমাদের মনে সন্দেহ জাগে। গত পনের দিন আগে আমি তার মোবাইল চেক করলে সে অভিমান করে। মনে হয়েছে আমি তার কক্ষের ঢোকার আগ মুহূর্তেই হয়তো কিছু গোপন জিনিস ডিলিট বা সরিয়ে ফেলেছে। তখন তাকে মোবাইলে একটি প্যারা পড়তে দেখি। এরপর থেকে যতই এই আত্মহত্যার দিন ঘনিয়ে আসে ততই সে আমাদের সঙ্গে বেশ আন্তরিকতা দেখিয়ে যাচ্ছিলো। তাকে যেন কোনোভাবে সন্দেহ না করি। আত্মহত্যা নির্বিঘœ ও মৃত্যু নিশ্চিত করতে আগেই সে বেশ পরিকল্পনা করে। পরে ঘটনার দিন সকাল সাড়ে ৬টার দিকে তার মা ঘুম থেকে জাগার পর আমরা মর্নিং ওয়াকে বের হওয়ার আগে দরজায় টোকা দেয়। দরজা বন্ধ পেয়ে চাবি দিয়ে দরজা খোলে এরপর মেয়েকে ফ্যানের সঙ্গে গলায় নাইলনের ওড়না পেঁচানো অবস্থায় ঝুলতে দেখেন। দেশের কিশোর-কিশোরীদের রক্ষা করতে বাংলাদেশ সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে বলে মনে করেন তথ্য প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ রেজা সেলিম। তিনি বলেন, সরকারকে প্রথমে এই গেমসের ওয়েব লিঙ্কটি বন্ধ করে দিতে হবে। অভিভাবকদের সচেতনতায় সরকারকে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। অন্যদিকে অভিভাবকদের উচিত হবে তার সন্তান প্রযুক্তি কিভাবে ব্যবহার করছে সেদিকে লক্ষ্য রাখা। সে যাতে কোনোভাবেই এ ধরনের খারাপ কিছুতে যুক্ত হতে না পারে সেজন্য প্রযুক্তি সম্পর্কে সচেতনতা জরুরি। গেমটি ইন্টারনেট থেকে মুছে ফেলতে আন্তর্জাতিক স¤প্রদায়কে উদ্যোগ নিতে হবে বলেও মনে করেন তিনি।
ব্ল-হোয়েল আসলে কী:
এটি আদতে সফটওয়্যার, অ্যাপ্লিকেশন কিংবা নিছক গেম নয়। এটি সোশ্যাল মিডিয়া ভিত্তিক একটি ডিপওয়ে গেম। যেসব কম বয়সী ছেলে-মেয়ে অবসাদে ভোগে তারাই সাধারণত আসক্ত হয়ে পড়ে এ গেমে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কোনো ক্লান্তি বা বিষন্ননতা দূর করার গেম নয়। আত্মহত্যার প্রবেশ পথ মাত্র। ভারতে ব্ল-হোয়েলে আসক্ত হয়ে আত্মঘাতী কয়েক তরুণের সুইসাইডাল নোটে লিখেছে ব্ল-হোয়েলে ঢোকা যায়, বের হওয়া যায়না। জানা যায়, এই গেমে ৫০টি ধাপ রয়েছে। প্রথম দিকে একই গেমের কিছু সহজ কাজ থাকে। এক বা একাধিক কিউরেটর দ্বারা চালিত হয় এই গেম। কিউরেটরদের নির্দেশেই গেমের এক একটি নিয়ম মেনে চলতে থাকে অংশ গ্রহণকারীরা। নিয়ম অনুযায়ী একবার এই গেম খেললে বেরুনো যায় না। কেউ বেরুতে চাইলেও তাদের চাপে রাখতে পরিবারকে মেরে ফেলার হুমকি পর্যন্ত দেয়া হয় বলে আলোচনা আছে। এই গেমের বিভিন্ন ধাপে রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। যেমন বেøড দিয়ে হাতে তিমির ছবি আঁকা, সারা গায়ে আঁচড় কেটে রক্তাক্ত করা, কখনো ভোরে একাকি ছাদের কার্নিশে ঘুরে বেড়ানো, রেল লাইনে সময় কাটানো, ভয়ের সিনেমা দেখা ইত্যাদি। চ্যালেঞ্জ নেয়ার পর এসব ছবি কিউরেটরকে পাঠাতে হয়। ২৭তম দিনে হাত কেটে ব্ল-হোয়েলের ছবি আঁকতে হয়। একবার এই গেম খেললে কিউরেটরের সব নির্দেশই মানা বাধ্যতামূলক। সব ধাপ পার হওয়ার পর ৫০তম চ্যালেঞ্জ হলো আত্মহত্যা। এই চ্যালেঞ্জ নিলে গেমের সমাপ্তি। রাশিয়ায় শুরু হলেও এই গেমের শিকার এখন এশিয়ার অনেক দেশ। ভারতে গত দু’মাস ধরে ব্ল-হোয়েল নিয়ে চলছে শোরগোল। স্যোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে থাকা ব্ল-হোয়েল লিংক সরিয়ে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে সে দেশের সরকার। পাশাপাশি এই চ্যালেঞ্জের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের খুঁজতে বাড়ানো হয়েছে নজরদারি। সাধারণভাবে গোপন গ্রুপের মধ্যে অপারেট করা হয় এ গেম। এ ক্ষেত্রে ফেসবুক, হোয়াটস অ্যাপের মতো জনপ্রিয় স্যোশাল ফ্লাট ফরমকে কাজে লাগায় এডমিনরা। সূত্র মতে, ২০১৬ সালে রাশিয়ায় ব্ল-হোয়েল গেমের কিউরেটর সন্দেহে ফিলিপ বুদেকিন নামের ২২ বছরের এক তরুণকে গ্রেফতার করে পুলিশ। জেরায় ফিলিপ স্বীকার করে, এই চ্যালেঞ্জের যারা শিকার তারা এই সমাজে বেঁচে থাকার যোগ্য নয়। তাদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে আমি সমাজ সংস্কারকের কাজ করছি।
কীভাবে বুঝবেন কেউ ব্ল-হোয়েলে আসক্ত:
যেসব কিশোর-কিশোরী ব্ল-হোয়েল গেমে আসক্ত হয়ে পড়েছে তারা সাধারণভাবে নিজেদেরকে সব সময় লুকিয়ে রাখে। স্বাভাবিক আচরণ তাদের মধ্যে দেখা যায় না। দিনের বেশিরভাগ সময় তারা কাটিয়ে দেয় স্যোশাল মিডিয়ায়। থাকে চুপচাপ। কখনো আবার আলাপ জমায় অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে। গভীর রাত পর্যন্ত ছাদে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায় অনেককে। একটা সময়ের পর নিজের শরীরকে ক্ষত-বিক্ষত করে তুলতে থাকে তারা। বিশেষজ্ঞদের মতে, কেউ যদি এই গেমে আসক্ত হয়ে পড়ে তবে তার আচরণে আগে থেকেই কিছু আঁচ করা সম্ভব হবে। এক দিনেই কোনো মানুষ আত্মহত্যাকে বেঁছে নিতে পারে না। তাই শিশুর আচরণে কোনো ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করলে সঙ্গে সঙ্গে তার প্রতি নজরদারি বাড়িয়ে তাকে বিপথগামী হওয়ার পথ থেকে রক্ষা করতে হবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2017-2019 AmarSurma.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: