বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৪১ পূর্বাহ্ন

ব্রেকিং নিউজ :
প্রতিনিধি আবশ্যক: অনলাইন পত্রিকা আমার সুরমা ডটকমের জন্য প্রতিনিধি নিয়োগ দেয়া হবে। আগ্রহীরা যোগাযোগ করুন : ০১৭১৮-৬৮১২৮১, ০১৭৯৮-৬৭৬৩০১
সংবাদ শিরোনাম :

মামলাবাজের দৌরাত্ম্যে দিরাইয়ে পুরুষ শূন্য গ্রাম

আমার সুরমা ডটকম:

সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার মকসদপুর গ্রামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযোগ ও একাধিক মামলার জেরে গ্রামবাসীর জীবনযাত্রা চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

সরেজমিনে গ্রামের বিভিন্ন বয়সী মানুষের সঙ্গে কথা বললে তারা অভিযোগ করে বলেন, আবু হানিফের ছেলে নুরুজ্জামান (৪৫) নামের ওই ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে গ্রামবাসীর সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে বিভিন্ন ঘটনায় মামলা দিয়ে গ্রামের অধিকাংশ পুরুষকে পলাতক থাকতে বাধ্য করছেন।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে আরো জানা যায়, গত বছর গ্রামবাসীর যৌথ মালিকানাধীন একটি ক্ষুদ্র জলমহাল ইজারা দেওয়ার লক্ষ্যে উন্মুক্ত ডাক অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশ নেন নুরুজ্জামান। তবে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রে গ্রামের জুনেদ মিয়া সর্বোচ্চ দর দিয়ে জলমহালটি ইজারা নেন। এরপর থেকেই নুরুজ্জামান ক্ষুব্ধ হয়ে নানা চক্রান্তে লিপ্ত হন বলে অভিযোগ গ্রামবাসীর।

স্থানীয়দের দাবি, ইজারা নেওয়ার কিছুদিন পর গভীর রাতে গোপনে জলমহালে বিষ প্রয়োগ করে মাছের ব্যাপক ক্ষতি করা হয়। বিষয়টি ধরা পড়লে গ্রামবাসী আইনের আশ্রয় নিতে উদ্যোগী হলে এলাকাবাসীর মধ্যস্থতায় শালিস বৈঠক হয়। বৈঠকে অভিযোগ প্রমাণিত হলে নুরুজ্জামান দোষ স্বীকার করে ক্ষমা চান এবং জরিমানা প্রদান করেন বলে জানান তারা।

এরপর গত বছরের ২৯ জুলাই তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে নুরুজ্জামান ও তার ভাই নুর উদ্দিনের সঙ্গে মাসুম চৌধুরীর বিরোধ বাধে। এ ঘটনার জের ধরে মাসুম ও তার পরিবারের সদস্যদের আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, তারা পলাতক থাকার সুযোগে মাসুমের ফাঁকা বাড়ি থেকে মূল্যবান মালামাল ও একটি নৌকা নিয়ে নেওয়া হয়। পরে ওই নৌকাটি পার্শ্ববর্তী রাজনগর গ্রামের আফরোজ মিয়ার কাছে বিক্রি করেন নুরুজ্জামান। খবর পেয়ে পুলিশ নৌকাটি উদ্ধার করে। এছাড়া গ্রামের যৌথ সম্পত্তি সংক্রান্ত এক বৈঠকে নুরুজ্জামান, তার ভাই ও ছেলেকে নিয়ে সাজুল হকের ওপর হামলার অভিযোগও রয়েছে। এ ঘটনায় থানায় অভিযোগও দায়ের করা হয়।

গত ১৫ অক্টোবর গ্রামের ২২ খতিয়ানের ওয়ারিশানদের যৌথ মালিকানাধীন জমিতে নুরুজ্জামান তার বোনের জন্য ঘর নির্মাণের চেষ্টা করলে গ্রামবাসী বাধা দেয়। পরে বিষয়টি আদালতে গড়ালে আদালত নির্মাণে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।

তবে গত ১৪ জানুয়ারি সেই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে পুনরায় ঘর নির্মাণের চেষ্টা করলে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে কয়েকজন আহত হন। এ ঘটনায় শারীরিকভাবে অসুস্থ মিহির চৌধুরীকে প্রধান আসামি করে ৭৭ জনের বিরুদ্ধে দিরাই থানায় মামলা দায়ের করা হয়।

নুরুজ্জামানের দায়ের করা মামলার ২ নম্বর সাক্ষী আব্দুর রউফ বলেন, গত ১৪ জানুয়ারি আমাদের গ্রামে নুরুজ্জামান ও তার পক্ষের লোকজনের সঙ্গে গ্রামবাসীর মারামারির ঘটনা ঘটে। ওই সময় আমি পরিস্থিতি শান্ত করতে গেলে ঢিলের আঘাতে আহত হই। কিন্তু আমাকে না জানিয়েই নুরুজ্জামান তার মামলায় ২ নম্বর সাক্ষী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেন। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, মিহির চৌধুরী আমাকে হত্যার উদ্দেশ্যে রামদা দিয়ে আঘাত করেছে যা সম্পূর্ণ মিথ্যা। তিনি আরও বলেন, আমি ছাড়াও মামলার ৩ নম্বর সাক্ষী জুবারুল হোসেন, ৪ নম্বর সাক্ষী আবুল কালাম এবং ৫ নম্বর সাক্ষী আনহার মিয়াকেও না জানিয়ে সাক্ষী করা হয়েছে। আমরা গত ৩০ মার্চ এফিডেভিট করে আদালতে জবানবন্দি দিয়ে বিষয়টি পরিষ্কার করেছি।

গ্রামবাসীর দাবি, ঘটনার দিন অধিকাংশ আসামি ঘটনাস্থলে উপস্থিতই ছিলেন না। একই ঘটনায় গ্রামবাসীর পক্ষ থেকেও পাল্টা মামলা দায়ের করা হয়েছে।

বর্তমানে মামলার ভয়ে গ্রামের অধিকাংশ পুরুষ বাড়িছাড়া। এতে পরিবারের নারী ও শিশুরা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। বিশেষ করে চলতি বোরো মৌসুমে ফসল ঘরে তোলা নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

গ্রামের প্রবীণ মুরুব্বি জিল্লুর রহমান চৌধুরী বলেন, একজন মানুষের কারণে পুরো গ্রামের পরিবেশ নষ্ট হয়ে গেছে। আমরা শান্তিতে থাকতে চাই, কিন্তু বারবার মামলা দিয়ে আমাদের হয়রানি করা হচ্ছে। গ্রামের সাজুল হক বলেন, আমার ওপর হামলা করা হয়েছে। আমরা আইনের আশ্রয় নিয়েছি। কিন্তু উল্টো আমাদের বিরুদ্ধেই মামলা দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দা পরিমল দাস বলেন, মামলার ভয়ে গ্রামের পুরুষরা পালিয়ে আছে। বাড়িতে নারী-শিশুরা অসহায় অবস্থায় আছে। আমরা এই পরিস্থিতির অবসান চাই।

অভিযোগ রয়েছে, সাম্প্রতিক সংঘর্ষের পর নুরুজ্জামান ও তার স্বজনরা নিজেদের বাড়িতে ভাঙচুর চালিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্ষণ ও লুটপাটের অভিযোগ তুলে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন, যা গ্রামবাসীর দাবি অনুযায়ী সম্পূর্ণ বানোয়াট এবং প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর চেষ্টা।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত নুরুজ্জামান মিয়ার বক্তব্য জানার জন্য তার বাড়িতে গেলে তাকে না পেয়ে তার ০১৭৭১৮৭২৩৮৩ নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

গ্রামবাসীর দাবি, দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক, যাতে এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরে আসে।

এ বিষয়ে দিরাই থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) এনামুল হক চৌধুরী বলেন, বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মকসদপুর গ্রামের দুপক্ষের মাঝে বিরোধ চলছে। উভয়পক্ষই মামলা দায়ের করেছে। এ ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2017-2019 AmarSurma.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com