শনিবার, ১৫ Jun ২০২৪, ০৫:৩৯ অপরাহ্ন

ব্রেকিং নিউজ :
প্রতিনিধি আবশ্যক: অনলাইন পত্রিকা আমার সুরমা ডটকমের জন্য প্রতিনিধি নিয়োগ দেয়া হবে। আগ্রহীরা যোগাযোগ করুন : ০১৭১৮-৬৮১২৮১, ০১৭৯৮-৬৭৬৩০১
সংবাদ শিরোনাম :

আজ ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চ দিবস

৪৫ বছর আগে আজকের এদিনে ভারতের পানি আগ্রাসী নীতির বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিলেন মওলানা ভাসানী

রেজাউল করিম রাজু:

আজ ১৬ মে ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চ দিবস। ৪৫ বছর আগে আজকের এদিনে ভারতের পানি আগ্রাসী নীতির বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিলন সারা বিশ্বের নিপীড়িত নির্যাতিত মজলুম মানুষের সংগ্রামী নেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। লাখো কন্ঠের গগন বিদারী মুহু মুহু শ্লোগানের মধ্যদিয়ে বজ্রকন্ঠে ঘোষনা করেছিলেন মরনবাঁধ ফারাক্কা ভেঙ্গে দাও গুড়িয়ে দাও। ফারাক্কা বাঁধ চালুর সময় এর কি ভয়াবহ বিরুপ প্রতিক্রিয়া হতে পারে তা পয়তাল্লিশ বছর আগে অনুধাবন করেছিলেন এ দূরদর্শী মজলুম জননেতা। আজ থেকে পয়তাল্লিশ বছর আগে মরনবাঁধ ফারাক্কা ভেঙ্গে দাও গুড়িয়ে দাও। গঙ্গার স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে দাও বলে শ্লোগান নিয়ে লংমার্চের মাধ্যমে যে আওয়াজ তুলেছিলেন তা আজও আন্দোলিত করে আকাশ বাতাসে। পদ্মার নি:স্প্রান তরঙ্গে তারই প্রতিধ্বনি শোনা যায়। নেপালের গন্ডাক থেকে গঙ্গার তীর ভারতের মালদার ফারাক্কা বিহার আর বাংলাদেশের সর্বত্র এখন আওয়াজ উঠেছে নদীকে তার স্বাভাবিক প্রবাহে চলতে দাও। সব ব্যারেজ আর ক্যানেল অপসারন করো। নদী বাঁচাও মানুষ বাঁচাও দেশ বাঁচাও।

১৯৭৬ সালের মে মাসের লংমার্চের পটভুমি ছিল বাংলাদেশের পরিবেশ প্রকৃতি জীব বৈচিত্র কৃষি মৎস্য নৌ যোগাযোগ তথা সার্বিক জীবন জীবীকার উপর সর্বনাশা ফারাক্কা ব্যারেজের বিরুপ প্রভাব। আসন্ন বিপর্যয়ের বিষয়টা অনুধাবন করতে পেরে আর্ন্তজাতিক নদী পদ্মার পানির নায্য হিস্যার দাবিতে গর্জে ওঠেন মওলানা ভাসানী। ডাক দেন ফারাক্কা লংমার্চের। তার ডাকে সাড়াদিয়ে আওয়াজ ওঠে চলো চলো ফারাক্কা চল। মরন বাঁধ ফারাক্কা ভেঙ্গে দাও গুড়িয়ে দাও। লংমার্চে যোগ দেবার জন্য সারা দেশ থেকে বিভিন্ন পথে সে সময় লাখো মানুষ জমায়েত হয়েছিল রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা ময়দানে। সেখানে তিল ধারনের জায়গা ছিলনা। মানুষ অবস্থান নিয়েছিল মাদ্রাসা ময়দানের আশেপাশে এলাকাজুড়ে। চারিদিক ছিল মানুষ আর মানুষ। মুর্হু মুর্হু শ্লোগান ছিল চলো চলো ফারাক্কা চলো। পদ্মার তীরে অবস্থিত ঐতিহাসিক মাদ্রাসা ময়দানে বিখ্যাত তালের টুপি সফেদ লুঙ্গি আর পাঞ্জাবী পরিহিত মওলানা ভাসানী লংমার্চ নিয়ে চাপাইনবাবগঞ্জ যাবার আগে স্বভাব সুলভ ভঙ্গিতে দশ মিনিটের এক জ্বালাময়ী ভাষন দেন যা ছিল দিক নির্দেশক ও উদ্দীপক। এরপর লাখো মানুষকে সাথে নিয়ে চাপাইনবাবগঞ্জের উদ্যেশে লংমার্চ নিয়ে রওনা হন। রাজশাহী শহর পার হতে না হতে লংমার্চ পড়ে বিরুপ আবহাওয়ার মুখে। ঝড় বৃষ্টি আর খরতাপ মাথায় নিয়ে এগিয়ে চলে কাফেলা। কোন কিছুই কাফেলার যাত্রা রোধ করতে পারেনি। রাতে লংমার্চের মানুষের বহর থামে চাপাইনবাবগঞ্জে। রাতে কিছুক্ষন বিশ্রাম নেবার পর ফের সকালে যাত্রা। পথের যাত্রা বিরতির সময় খাবার ছিল সামান্য ডাল চালের খিচুড়ি আর শুকনো চিড়া। রাজশাহী চাপাইনবাবগঞ্জের মানুষের আতিথেয়তা ছিল আনন্দের ব্যাপার। অনেক রোডমার্চ, লংমার্চ হয়েছে। সব শ্রেনীর মানুষের এমন স্বর্ত:স্ফুত অংশগ্রহন আর কখনো হয়নি। মাইলের পর মাইল আম বাগান পেরিয়ে ভারত সীমান্তের কাছাকাছি কানসাটে গিয়ে থামে কাফেলা। এখানে পনের মিনিটের ভাষনে লংমার্চের নেতৃত্বদানকারী মজলুম জনতার কন্ঠস্বর মওলানা ভাসানী বজ্রকন্ঠে আওয়াজ তোলেন গঙ্গার পানি আমার জন্মগত অধিকার। এ অধিকার আমরা আদায় করে ছাড়ব। ভারত সরকারের জানা উচিত বাংলাদেশের মানুষ আল্লাহকে ছাড়া কাউকে ভয় করেনা। আমরা আমাদের অধিকারের আদায়ের লংমার্চ করতে এসেছি। কারো সাথে যুদ্ধ করতে নয়।

উল্লেখ্য লংমার্চ যদি সীমান্ত অতিক্রম করে ফারাক্কা ব্যারেজ চলে আসে এমন শংকায় ভারত সীমান্তে প্রচুর সৈন্য মোতায়েন করেছিল। ফারাক্কা লংমার্চে লাখো মানুষের এমন স্বত:স্ফুত অংশগ্রহন আর লক্ষকন্ঠের গগন বিদারী শ্লোগান ভারতের শাসক গোষ্টির কপালে দু:চিন্তার ভাঁজ ফেলেছিল। সারা বিশ্ববাসী অবাক বিস্ময়ে আরেকবার দেখেছিল সদ্য স্বাধীন হওয়া একটা দেশের মানুষ তাদের নায্য হিস্যা আদায়ের জন্য কেমন ইস্পাত কঠিন ঐক্য গড়ে তুলতে পারে। ফারাক্কা লংমার্চের রেশ ধরে ফারাক্কা ইস্যুটি জাতিসংঘ পর্যন্ত গিয়েছিল। ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘের সাধারন পরিষদের ৪৮তম অধিবেশনে উত্থাপন করা হয়। ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে ত্রিশ বছর মেয়াদী গঙ্গার পানি বন্টন চুক্তি হয়। কিন্তু বাংলাদেশ আজ পর্যন্ত তার পানির নায্য হিস্যাটুকু পায়নি। বরং পানি চুক্তিতে গ্যারান্টিক্লজ ও সালিশী ব্যবস্থার কথা কৌশলে এড়িয়ে যাবার কারনে পানির নায্য হিস্যা না পেলেও বিশ্ব দরবারে (জাতিসংঘ) নালিশ জানানোর পথটি বন্ধ হয়ে যায়। আর এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে ভারতের পানি জল্লাদরা তাদের পানি শোষন নীতিকে আরো আটোসাটো করে ভাটির দেশ বাংলাদেশকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে। শুধু ফারাক্কা নয় অভিন্ন ৫৪টি নদীর সবকটি স্বাভাবিক প্রবাহে বাধাগ্রস্ত করছে। ১৯৭৬ সালে দুরদর্শী নেতা মওলানা ভাসানী যে আওয়াজ তুলেছিলেন তা এখন বাংলাদেশ, ভারত নেপাল সিকিম সর্বত্র অনুরিত হচ্ছে। নেপাল থেকে এসেছিলেন নদীর অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে ওয়াটার কমন্স ফোরাম নামে একটি সংগঠনের প্রতিনিধি দল। তারা নেপালের গন্ডাক নদী এরপর ভারতের গঙ্গা পাড়ের বিভিন্নস্থানে সমাবেশ করে। ফারাক্কা হয়ে তারা বাংলাদেশের রাজশাহীর গোদাগাড়ি ও আলুপট্টি এলাকায় পদ্মা তীরে সমাবেশ করে গঙ্গার ওপর ব্যারেজ নির্মানের ফলে কি ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে তা তুলে ধরেন। ঢাকায় সমাবেশ করে বলেন গঙ্গার প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করার কারনে নেপাল ভারত বাংলাদেশ সবার ক্ষতি হচ্ছে। ইতোমধ্যে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার ফারাক্কার কারনে কি ভয়াবহ ক্ষতি হচ্ছে তা তুলে ধরে বলেন ফারাক্কা ব্যারেজের কারনে কোন উপকার নেই বরং ক্ষতি হচ্ছে। এ কারনে ফারাক্কা ব্যারেজ ভেঙ্গে দেবার দাবি জানান। এর আগে পশ্চিমবঙ্গের বিশেষজ্ঞরা ব্যারেজের বিরুপ প্রতিক্রিয়া সর্ম্পকে হুশিয়ারী উচ্চারন করেন।

উল্লেখ্য ফারাক্কা ব্যারেজ নির্মানের সমীক্ষার সময় (১৮৪১-১৯৪৬) নেতিবাচক প্রভাবের কথা বলা হয়েছিল। ফারাক্কা ব্যারেজ তৈরী করার সময় পশ্চিম বঙ্গের প্রধান প্রকৌশলী কপিল ভট্টাচার্য এর বিরোধীতা করে বিরুপ সমালোচনার শিকার হন। ভারত সব শংকাকে উপেক্ষা করে ফারাক্কা ব্যারেজ নির্মান করে। তারপরও গঙ্গাকে ঘিরে বাস্তবায়ন করে নানা প্রকল্প। পানির অভাবে ভাটির দেশ বাংলাদেশের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের ছয়কোটি মানুষের জীবন দূর্বিসহ হয়ে উঠলেও তা আমলে নিতে নারাজ ভারতের পানি শোষনকারী নীতিনির্ধারকরা। বাংলাদেশ ভারত নেপাল সর্বত্রই ভারতের পানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হলেও বাংলাদেশের এক শ্রেণীর কথিত বুদ্ধিজীবী এ ব্যাপারে একবারে নীরব। জাতির এই সংকটকালে আজ বড্ড প্রয়োজন অনুভুত হচ্ছে মওলানা ভাসানীর মত একজন সর্বজন শ্রদ্ধেয় নেতার। যার এক আওয়াজে গোটাজাতি ফারাক্কা লংমার্চের মত ঐক্যবদ্ধ হয়ে বাংলাদেশের নদী গুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে কার্যকর ভুমিকা রাখবে। বিশিষ্ট কবি আব্দুল হাই সিকদার গতকাল আলাপকালে স্মরন করিয়ে দেন ‘‘ডাক’’ কবিতার আহবান- ফারাক্কা বাঁধ ভাঙ্গবে এখন কে ? কোথায় সোনার ভাসানি আজ তাকে খবর দে- ভাসানি নেই ভাসানি নেই প্রাণ কাড়া চিৎকার, ঈশা খানের দেশে একি অভাব হাহাকার?

সূত্র: দৈনিক ইনকিলাব

নিউজটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2017-2019 AmarSurma.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com