শনিবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৪, ১২:৫৭ অপরাহ্ন

ব্রেকিং নিউজ :
প্রতিনিধি আবশ্যক, অনলাইন পত্রিকা আমার সুরমা ডটকমের জন্য প্রতিনিধি নিয়োগ দেয়া হবে। আগ্রহীরা যোগাযোগ করুন : ০১৭১৮-৬৮১২৮১, ০১৬২৫-৬২৭৬৪৩
অভাবেই স্বাধীনতার মাসে বিষপানে আত্মহত্যা বীর মুক্তিযোদ্ধা!

অভাবেই স্বাধীনতার মাসে বিষপানে আত্মহত্যা বীর মুক্তিযোদ্ধা!

amarsurma.com

আমার সুরমা ডটকম:
অভাবের তাড়না সইতে না পেরে ও সরকারিভাবে বন্দোবস্তপ্রাপ্ত ভুমি উদ্যারে প্রশাসনের সহায়তা না পাওয়ার ক্ষোভে অবশেষে স্বাধীনতার মাসেই বিষপানে আত্মহত্যা করলেন জলফে আলী (৭৮) নামের এক বয়োবৃদ্ধ বীরমুক্তিযোদ্ধা!
সোমবার বেলা সাড়ে ১১টায় প্রয়াত এ বীর মুক্তিযোদ্ধাকে শেষ বারেরমত রাষ্ট্রীয় সম্মাননায় নিজ গ্রামেই দাফন করা হয়।
রবিবার বিকালে সুনামগঞ্জ জেলা শহরে মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সের শৌচাগারে গিয়ে তিনি কীটনাশক (বিষ) পান করেন।
জলফে আলী সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়নের গুদিগাঁও গ্রামের আমির আলীর ছেলে। তিনি ১৯৭১ সালে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে বীরত্বের স্বাক্ষর রাখেন। প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধার পারিবা রিক সুত্রে জানা যায়, রবিবার সকালে সিলেটে যাবার কথা বলে জলফে আলী সদর উপজেলার গুদিগাঁওর নিজ বাড়ি থেকে বের হয়ে আসেন।
জেলা শহর সুনামগঞ্জ পৌছার পর ওই দিন সকাল ১০টায় জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৯৯তম জন্মবার্ষিকী ও জাতীয় শিশু দিবসে ৭১র সহযোদ্ধা, সরকারি-বেসরকারি দফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারী, রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃদ্ধের সাথে জেলা শহরে শিশু সমাবেশ ও বর্ণাঢ্য আনন্দ র‌্যালীতে অংশ গ্রহণ করেন।
এরপর দুপুরের দিকে তিনি ফিরে যান জেলা শহরে থাকা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সে। মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সের তৃতীয় তলায় শৌচাগারে গিয়ে ঘন্টা/তিনেক পেরিয়ে গেলে তিনি নীচতলায় ফিরে না আসায় তার সন্ধানে তৃতীয় তলায় যান নৌশ
প্রহরি।
বিকেল সাড়ে চারটার দিকে মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সে নৈশ প্রহরি আতিকুর রহমান সোহাগ শৌচাগারে সামনে গেলে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ পান। এরপর দরজা ভেতর থেকে বন্ধ পাওয়া ভেতরে কোন ব্যাক্তির অবস্থান অনুমান করতে পারলেও ভেতর থেকে কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে আশপাশের লোকজনকে ও ব্যবসায়ীদেরকে ডেকে তিনি জড়ো করেন।
এক পর্যায়ে শৌচাগারের দরজা ফুটো করে দেখেন একজন মানুষের নিথর দেহ পড়ে আছে। পরবর্তীতে সদর মডেল থানা পুলিশকে খবর দিলে পুলিশ এসে দরজা ভেঙে শৌচাগারের ভেতর পড়ে থাকা বীরমুক্তি জলফে আলীর লাশ উদ্ধার করে। লাশের পাশেই পড়েছিল কীটনাশকে (বিষ)-র বোতল ।
সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানার এসআই প্রদীপ কুমার চক্রবর্তী বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে বিষপান করেই বীরমুক্তিযোদ্ধা আত্মহত্যা করে থাকতে পারেন। সুরতহাল রিপোর্ট তৈরীর পর রবিবার রাতে লাশ মর্গে পাঠানোর পর ময়নাতদন্ত শেষে ওই রাতেই মুক্তিযোদ্ধার লাশ পরিবারের নিকট হস্তান্তর করা হয়।
এ ব্যাপারে প্রয়াত বীরমুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী মরিয়ম বিবি রবিবার রাতে সদর মডেল থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা ডায়রীভুক্ত করেন। ওই মামলায় তিনি তার স্বামীর মৃত্যুর কারন উল্ল্যেখ করেছেন।
জানা গেছে, জলফে আলী একজন রাষ্ট্রীয়ভাতা প্রাপ্ত বীরমুক্তিযোদ্ধা। প্রথম স্ত্রী মৃত্যুর পর তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেন। প্রথম পক্ষের স্ত্রীর চার ছেলে মেয়ে ঢাকায় অবস্থায় করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন। এদিকে গ্রামের বাড়ি সুনামগঞ্জের গুদিগাঁও দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করতেন জলফে আলী। দ্বিতীয় স্ত্রীর দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন অন্যত্র। মেয়ের জামাইরাও দিনমজুরী করেন।
সোমবার দাফন শেষে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার গুদিগাঁও নীজ বাড়িতে প্রয়াত বীর মুত্তিযোদ্ধা জলফে আলীর সদ্য বিধবা স্ত্রী মরিয়ম বিবি (৫৫) ও তার পরিবারের সদস্যদের সাথে গণমাধ্যম কর্মীদের সাথে আলাপকালে তারা জানান, ভুমিহীন মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে জলফে আলী সদর উপজেলার নারায়ণতলা মৌজায় প্রায় দুই যুগ পুর্বে ৮০ একর ভুমি সরকারিভাবে বন্দোবস্ত পান। এরপর ওই ভুমিতে নিজের দখলে টিনশেডের একটি ছোট নরবরে বসতঘর ছাড়া অধিকাংশ ভুমি অন্যরা দখল করে ভোগ করতে থাকেন। ওই ভুমি নিজের দখলে পেতে গত প্রায় ৫ থেকে ৬ বছর ধরে
উপজেলা নির্বাহী অফিসার, জেলা প্রশাসকসহ প্রশাসনের বিভিন্ন দফতরে আবেদন-অভিযোগ করেও দিনের পর দিন ধর্ণা দিলেও বন্দোবস্তপ্রাপ্ত ভুমি উদ্যারে প্রশাসনের তরফ থেকে কোন রকম সহযোগীতাই পাননি ওই বয়োবৃদ্ধ বীর মুক্তিযোদ্ধা।
এ কারণে তিনি স্থানীয় প্রশাসনের প্রতি ক্ষোভের পাশাপাশী ক্রমশ হতাশায় ভুগছিলেন। এমন হতাশা থেকে মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়লে বয়োবৃদ্ধ মুক্তিযোদ্ধার নানা রোগ ব্যাধি ও সংসারে অভাব অনটনও জেকে বসে। প্রথম পক্ষের প্রয়াত স্ত্রীর চার ছেলে মেয়ে ঢাকায় থাকলেও দ্বিতীয় স্ত্রীর গর্ভে জন্ম নেয়া দুই মেয়েকে গ্রামেই বিয়ে দেয়া হয়, দুই মেয়ের পরিবারও ছিল অস্বচ্ছল। মেয়ের জামাইরা দিনমজুরি করে কোন রকম জীবিকা নির্বাহ করতেন।
সোমবার প্রয়াত বীরমুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী মরিয়ম বিবি জানান, ভুমিটি পুরোপুরি উদ্ধার হলে জীবনের শেষ সময়ে ঢাকায় ও গ্রামে থাকা ছেলে মেয়েদের বসবাসের জায়গা করে দিয়ে যাবার জন্য তিনি উদ্ভিগ্ন ছিলেন, কিন্তু ভুমি উদ্ধারে তিনি প্রশাসনের কোন সহযোগীতা না পেয়ে ভুগতে ভুগতে গতকয়েক মাস ধরেই বাড়িতে বলাবলি করতেন জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করলাম, জাতীর জনকের কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকল মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবার পরিজনকে নানা সুযোগ সুবিধা দেয়ার পাশাপাশী, সম্মান-ভালবাসাও দিয়েছেন কিন্তু স্থানীয় প্রশাসনে কোন প্রয়োজনে গেলে আমাদের তেমনভাবে কোন মুল্যায়ন করা হয় না।
তিনি আরো বলেন, মৃত্যুর দিন কয়েক পুর্বেও তিনি ভুমি উদ্ধারে সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নিকট আরো একদফা মৌখিকভাবে এমনকি লিখিত আবেদন করেছিলেন কিন্তু তাতেও সাড়া পাওয়া যায়নি, তাই হয়ত প্রশাসনের সহায়তা না পাওয়ার ক্ষোভে ও অভাবের তাড়না সইতে না পেরেই তিনি আত্মহত্যার পথ বেচে নিয়েছিলেন।
সোমবার সন্ধায় সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইয়াসমিন নাহার রুমার নিকট এ বিষয়ে বিস্তারিত অবহিত করে উনার বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, বহু বছর পুর্বে মুক্তিযোদ্ধা জলফে আলী ৮০ শতাংশ ভুমি সরকারিভাবে বন্দোবস্ত পেয়েছেন বলে বিষয়টি আমি জানি, মৃত্যুর দিন কয়েক পুর্বে উনি আমার সাথে অফিসে এসে দেখা করে আমাকে মৌখিকভাবে ওই ভুমি অন্যদের দখলের থাকা ও ভুমিটি উদ্ধারের জন্য সরকারি সহায়তা চেয়েছেন কিন্তু লিখিতভাবে কোন আবেদন তিনি করেন নি।

amarsurma.com

নিউজটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2017-2019 AmarSurma.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: