শুক্রবার, ০১ মার্চ ২০২৪, ০৬:০৪ পূর্বাহ্ন

ব্রেকিং নিউজ :
প্রতিনিধি আবশ্যক, অনলাইন পত্রিকা আমার সুরমা ডটকমের জন্য প্রতিনিধি নিয়োগ দেয়া হবে। আগ্রহীরা যোগাযোগ করুন : ০১৭১৮-৬৮১২৮১, ০১৬২৫-৬২৭৬৪৩
কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রো আর নেই

কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রো আর নেই

fidelkastoআমার সুরমা ডটকম ডেক্সকিউবার বিপ্লবী নেতা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট ফিদেল ক্যাস্ট্রো মৃত্যুবরণ করেছেন। কিউবার রাজধানী হাভানায় স্থানীয় সময় শুক্রবার রাত ১০টা ২৯ মিনিটে ৯০ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। দেশটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট ও ফিদেল ক্যাস্ট্রোর ভাই রাউল ক্যাস্ট্রো দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এ ঘোষণা দেন। কিউবা বিপ্লবের প্রধান নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রো ১৯৫৯ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ১৯৭৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত কিউবার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। এরপর ২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে তার ছোট ভাই রাউল ক্যাস্ট্রোর কাছে স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছেড়ে দেয়ার আগ পর্যন্ত কিউবার অব স্টেট ও কাউন্সিল অব মিনিস্টার্সের প্রেসিডেন্ট ছিলেন তিনি। শারীরিক অসুস্থতার কারণে ওই বছর রাউল ক্যাস্ট্রোর কাছে দায়িত্ব ছেড়ে দেন কিউবার কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক এই প্রধান।
১৯২৬ সালের ১৩ আগস্ট কিউবার পূর্বাঞ্চলে বিরান জেলায় স্পেনীয় বংশোদ্ভূত এক অভিবাসী পরিবারে ফিদেল ক্যাস্ট্রোর জন্ম। তার পুরো নাম ফিদেল আলেজান্দ্রো ক্যাস্ট্রো রুজ। একটি জেসুইট বোর্ডিং স্কুল থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করেন তিনি। লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলায়ও ফিদেল ছিলেন তুখোড়। ১৯৪৪ সালে কিউবার সেরা অলরাউন্ডার স্কুল অ্যাথলেট পুরস্কার পান। আইনের স্নাতক হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করেন। ডিগ্রি নেয়ার পরপরই হাভানায় একজন আইনজীবী হিসেবে পেশা জীবন শুরু করেন ক্যাস্ট্রো। দরিদ্র মক্কেলদের পক্ষে লড়ে অল্প সময়ের মধ্যেই সুনাম ও খ্যাতি অর্জন করেন এবং শিগগিরই সক্রিয় দলীয় রাজনীতিতে যোগ দেন।
১৯৪৭ সালে নবগঠিত কিউবান পিপলসপার্টিতে যোগ দেন ফিদেল। মার্কিন ব্যবসায়ী শ্রেণী ও সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অবিচার, দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও নিম্ন মজুরির অভিযোগ নিয়ে লড়াইয়ের আহ্বান জানিয়ে তুখোড় বক্তা ফিদেল দলের তরুণ সদস্যদের মধ্যে দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করেন। ১৯৫২ সালে দলীয় কংগ্রেসের সদস্য প্রার্থী হন তিনি। নির্বাচনে পিপলসপার্টির বিজয়ের সম্ভাবনা থাকলেও জাতীয় নির্বাচনের আগে জেনারেল বাতিস্তা সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে কিউবার ক্ষমতা দখল করলে নির্বাচন বাতিল হয়ে যায়। ১৯৫৩ সালে মনকাডা ব্যারাকে একটি ব্যর্থ আক্রমণ করেন এবং তারপর কারারুদ্ধ হন ও পরে ছাড়া পান। এরপর তিনি বাতিস্তার সরকার উৎখাতের জন্য সংগঠিত হওয়ার জন্য মেক্সিকো যান। ফিরে এসে ১৯৫৬ সালের ডিসেম্বরে সরকার উৎখাতে নামেন।
১৯৫৮ সালের মাঝামাঝি বাতিস্তার প্রায় ১ হাজার সেনা গেরিলাদের হাতে প্রাণ হারালে বিমান, বোমা, জাহাজ ও ট্যাংক পাঠিয়ে গেরিলাদের হটানোর চেষ্টা চালায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু নাপাম বোমার মতো সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করেও গেরিলাদের সঙ্গে বাতিস্তা পেরে না ওঠায় তাকে নির্বাচন দেয়ার পরামর্শ দেয় যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৫৮ সালের মার্চে বাতিস্তা নির্বাচন দিলেও জনগণ সে নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে। ৭৫ ভাগ থেকে শুরু করে কোথাও কোথাও ৯৮ ভাগ মানুষ ভোটকেন্দ্রেই যায়নি। ফিদেলের যোদ্ধারা চারদিক থেকে রাজধানী হাভানাকে ঘিরে ধরতে শুরু করলে ১৯৫৯ সালের পয়লা জানুয়ারি নববর্ষের দিনে কিউবা ছেড়ে পালান জেনারেল বাতিস্তা। এর কিছুদিন পরই ক্যাস্ট্রো কিউবার প্রধানমন্ত্রী হন। ১৯৬৫ সালে তিনি কিউবা কমিউনিস্টপার্টির প্রধান হন। ১৯৭৬ সালে তিনি রাষ্ট্র ও মন্ত্রিপরিষদের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন। চলতি বছরের আগস্ট মাসে কিউবার জনগণ ক্যাস্ট্রোর ৯০তম জন্মদিন উদযাপন করে। সেখানে এক অনুষ্ঠানে ক্যাস্ট্রো তার মৃত্যুর দিন ঘনিয়ে এসেছে বলে মন্তব্য করেন : ‘আমি যে ৯০ বছরে পা দিতে পারব তা স্বপ্নেও ভাবিনি।’ এ বছরে এপ্রিল মাসে কিউবার কমিউনিস্টপার্টির সপ্তম কংগ্রেসে ভাষণ দেন বর্ষীয়ান এই নেতা। এ সময় ক্যাস্ট্রো বলেছিলেন, তিনি হয়তো শিগগিরই মারা যাবেন। কিন্তু বিপ্লব নিয়ে তার পরিকল্পনাগুলো বেঁচে থাকবে। সূত্র : ওয়েবসাইট
ক্যাস্ট্রোকে ৬৩৮ বার হত্যার চেষ্টা করা হয়!
৯০ বছরের জীবনে ফিদেল ক্যাস্ট্রোকে ৬৩৮ বার হত্যার চেষ্টা করে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর চরেরা এই চেষ্টা চালায়। হত্যার ষড়যন্ত্র বেশির ভাগই করা হয় তার শাসনামলের শুরুতে। বহু বিদ্রোহের পর কিউবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১৯৫৯ সালে দায়িত্ব নেন ফিদেল ক্যাস্ট্রো। ২০০৮ সালে তার ভাই রাউল ক্যাস্ট্রোর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে বিদায় নেন ফিদেল। ক্যাস্ট্রোকে হত্যার চেষ্টা বেশির ভাগই হয় ১৯৫৯ থেকে ১৯৬৩ সালের মধ্যে। এ সময়ে পাঁচটি ভাগে সিআইএ, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষাবাহিনী ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র বিভাগ তাকে হত্যার বিভিন্ন চেষ্টা চালায়। তাকে কিউবার সিংহাসন থেকে নামাতে নেয়া হয় ‘অপারেশন মঙ্গুজ’ পরিকল্পনা। ফেবিয়ান এসকালান্তে ফিদেলের নিরাপত্তারক্ষী ছিলেন। ৪৯ বছরের শাসনামলে পুরো সময় তার নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন তিনি। তার তথ্যমতে, ৬৩৮ বার ক্যাস্ট্রোকে হত্যার চেষ্টা করে সিআইএ। প্রতিটি ষড়যন্ত্র ছিল অভিনব।
এসব ষড়যন্ত্রের মধ্যে জটিল ছিল ক্যাস্ট্রোর চুরুটের মধ্যে বিস্ফোরক দ্রব্য রাখা। নিউইয়র্কের এক পুলিশ কর্মকর্তা কাছ থেকে এই ফন্দি নেয় সিআইএ। ওই চুরুটের মধ্যে যে পরিমাণ বিস্ফোরক দ্রব্য রাখা হয়, তা তার মাথা উড়িয়ে দেওয়ার মতো। এ ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়। ক্যাস্ট্রোকে দুর্বল করতে একবার তার জুতো ও চুরুটের মধ্যে রাসায়নিক দ্রব্য রাখা হয়। এর প্রভাবে তার শরীরের সব চুল পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। বিভিন্ন সময়ে তার খাবারে বিষ রেখে হত্যার চেষ্টা করা হয়। তার ব্যবহৃত কলমে বিষযুক্ত সুচ রেখে ও পোশাকে জীবাণু ছড়িয়েও তাকে হত্যার চেষ্টা চালায় সিআইএ।
সিআইএর আরেকটি ষড়যন্ত্র ছিল সাবেক স্ত্রী মিরতাকে হাত করে ক্যাস্ট্রোকে হত্যার চেষ্টা। বিষযুক্ত ক্যাপসুল দিয়ে তাকে হত্যা করার ফন্দি আঁটা হয়। কোল্ডক্রিমের কৌটায় রাখা হয় এই ক্যাপসুল। কিন্তু এ ষড়যন্ত্রের কথা জেনে ফেলেন ক্যাস্ট্রো। তিনি মিরতার হাতে পিস্তল তুলে দিয়ে তাকে বিষ দিয়ে নয়, সরাসরি গুলি করে হত্যা করতে বলেন। মিরতা তা পারেন নি। শুধু হত্যার চেষ্টাই নয়, ক্যাস্ট্রোর ভাবমর্যাদা নষ্ট করার চেষ্টাও কম করেনি সিআইএ। একবার এক বেতারকেন্দ্রে সাক্ষাৎকার দিচ্ছিলেন ফিদেল। এ সময় স্টুডিওতে নেশাজাতীয় দ্রব্য ছড়িয়ে দেয়া হয়। এর প্রভাবে অদ্ভূত আচরণ করেন ফিদেল। বিচলিত হয়ে পড়ে পুরো কিউবা। তবে এবারও ব্যর্থতার পাল্লা ভারী হয় সিআইএর।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে শাসনামলের শেষের দিকে ২০০০ সালে পানামা সফরে যান ক্যাস্ট্রো। সেখানেও তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়। একটি মঞ্চে বক্তৃতা দেয়ার কথা ছিল তার। সেই মঞ্চে ভাষণ ডেস্কে ৯০ কেজি বিস্ফোরকদ্রব্য রাখা হয়। ক্যাস্ট্রোর নিরাপত্তাকর্মীরা এই চেষ্টা ব্যর্থ করে দেন। ক্যাস্ট্রোকে হত্যার ষড়যন্ত্র নিয়ে পরবর্তী সময়ে একটি প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করে যুক্তরাজ্যভিত্তিক চ্যানেল ফোর। ‘৬৩৮ ওয়েজ টু কিল ক্যাস্ট্রো’ নামের ওই প্রামাণ্যচিত্রে দেখানো হয়’ কত কৌশলে তাকে হত্যার চেষ্টা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০০৬ সালে যুক্তরাজ্যে সম্প্রচার করা হয় এটি। Ñসূত্র : ওয়েবসাইট
ফিদেল ক্যাস্ট্রোর কয়েকটি বিখ্যাত উক্তি:
সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের আইকন কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল আলেসান্দ্রো ক্যাস্ট্রো রুজ (ফিদেল ক্যাস্ট্রো) তার দীর্ঘ বিপ্লবী জীবনে অনেক অমর উক্তি করে গেছেন। তারই কিছু তুলে ধরা হলোÑ একটি সেনা ব্যারাকে অভিযানের পর ধরা পড়ে ১৯৫৩ সালের ১৬ অক্টোবর বিচারের মুখোমুখি ক্যাস্ট্রো বলেছিলেন, ‘আমাকে দোষী সাব্যস্ত করুন, এটা কোনো ব্যাপার না। ইতিহাস আমাকে মুক্তি দেবে’। ১৯৬১ সালের জানুয়ারিতে কিউবান বিপ্লবের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে এই অবিসংবাদিত নেতা বলেছিলেন, ‘বিপ্লব কুসুমাস্তীর্ণ বিছানা নয়। বিপ্লব হলো ভবিষ্যৎ এবং বর্তমানের মধ্যে আমৃত্যু সংগ্রাম’।
চিলিতে ১৯৭১ সালে ক্যাস্ট্রো বলেছেন, ‘আমি একজন খুবই ভাগ্যবান মানুষ ছিলাম যে একটি রাজনৈতিক মতবাদ আবিষ্কার করেছি। একজন মানুষ যে পুরোদস্তুর সাম্যবাদী হওয়ার আগে কিউবার রাজনৈতিক সংকটের ঘূর্ণাবর্তে আটকা পড়েছিল… জঙ্গলে একটি পথনির্দেশনা খুঁজে পাওয়ার মতোই মার্কসবাদকে আবিষ্কার করল’।
হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ৭ জুন তিনি বলেছিলেন, ‘আমার ইস্পাতের একটি হৃদয় আছে’। হাভানায় এক বক্তৃতায় ১৯৭৭ সালে এই বিপ্লবী বলেছিলেন, ‘আমরা কেবল লাতিন আমেরিকান জাতিগোষ্ঠীই নই, আমরা আফ্রো-আমেরিকান জাতিগোষ্ঠীও’।
বিশ্ব কমিউনিস্ট যুব সম্মলেনে ১৯৭৮ সালের ২৬ জুলাই তিনি বলেছিলেন, ‘কোন নৈতিকতায় (যুক্তরাষ্ট্রের) নেতারা মানবাধিকার নিয়ে কথা বলে, যাদের দেশে কোটিপতি এবং ভিক্ষুক আছে, যাদের দেশে কৃষ্ণাঙ্গরা বৈষম্যের শিকার, নারীদের পতিতাবৃত্তি করতে হচ্ছে, মেক্সিকান, পোয়ের্তোরিকান ও লাতিন আমেরিকানদের স্বীকৃতি নেই, তারা নির্যাতিত ও অপদস্থ’। সান্তা ক্লজ নিয়ে ১৯৯৮ সালের ডিসেম্বরে এই সমাজতন্ত্রী নেতা বলেছিলেন, ‘এটি মার্কিন বাণিজ্যবাদের কল্পিত বয়ানের মুখ্য প্রতীক’। ২০০০ সালের আগস্টে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি শেষ করলাম- হয়তো একটু দেরিতেই- বক্তব্য অবশ্যই ছোট হতে হবে’। সূত্র : ওয়েবসাইট।
সর্বশেষ ভাষণে যা বলেছিলেন ক্যাস্ট্রো:
চলতি বছরের ১৯ এপ্রিল কিউবার কমিউনিস্ট পার্টির সম্মেলনে হাজির হয়ে শেষ ভাষণ দেন বিপ্লবী ফিদেল ক্যাস্ট্রো। ভাই রাউল ক্যাস্ট্রোর হাতে ২০০৮ সালে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রো। এরপর থেকে লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যান তিনি। নিজের ৯০তম জন্মদিনে চলতি বছরের আগস্টে সর্বশেষ জনসম্মুখে এসেছিলেন ফিদেল ক্যাস্ট্রো। হাভানার কার্ল মার্কস থিয়েটারে জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অংশ নেন তিনি। তবে এই বিপ্লবীর কণ্ঠে মানুষ সর্বশেষ ভাষণ শুনেছেন চলতি বছরের ১৯ এপ্রিলে, কিউবার কমিউনিস্ট পার্টির সম্মেলনে। সম্মেলনে দেয়া বিরল ভাষণে ফিদেল ক্যাস্ট্রো আধুনিক সময়কে স্বীকার করে নেন। বলেন, ‘কিউবার কমিউনিস্ট ধারণা এখনও কার্যকর’।
সেখানেই শিগগিরই মারা যাবেন এমন ইঙ্গিত দিয়ে ফিদেল ক্যাস্ট্রো কিউবার জনগণের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নেন। ভাষণে নতুন প্রজন্মকে দায়িত্ব নেয়ার আহ্বান জানিয়ে ফিদেল ক্যাস্ট্রো বলেন, ‘কিছুদিনের মধ্যেই আমার বয়স ৯০ বছর হয়ে যাবে। তখন আমিও অন্যদের মতো হয়ে (মারা) যাব’। তিনি বলেন, ‘শেষ সময়টা আমাদের সবার জীবনেই আসবে। কিন্তু কিউবার কমিউনিস্ট দলের ধারণা, এই পৃথিবীতে আজীবন রয়ে যাবে। বিশ্ববাসী জানবে, যদি তারা সততার সঙ্গে কাজ করে, তাহলে তারা মানবসভ্যতার জন্য ভালো জিনিস ও সংস্কৃতি তৈরি করতে পারবে। আর এসবের জন্য আমাদের ক্রমাগত যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে’।
সপ্তম কংগ্রেসের উদ্বোধন করে আগামী ২০২১ সালে পরবর্তী কংগ্রেসের ঘোষণা দেন এই বিপ্লবী। সেই কংগ্রেসকে নতুন প্রজন্মের নেতারা নেতৃত্ব দেবেন আশা প্রকাশ করে ফিদেল ক্যাস্ট্রো বলেন, এবারের কংগ্রেসই হচ্ছে ঐতিহাসিক প্রজন্মের শেষ কংগ্রেস। এছাড়া আগামী পাঁচ বছরে কিউবার অর্থনীতিতে সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। ভাষণে বর্ষীয়ান এই বিপ্লবী বলেন, ‘তিনি হয়তো শিগগিরই মারা যাবেন। কিন্তু বিপ্লব নিয়ে তার পরিকল্পনাগুলো বেঁচে থাকবে’। সেই ভাষণের ঠিক সাত মাস পর সত্যিই চলে গেলেন কিংবদন্তী এই নেতা। শুক্রবার কিউবার রাজধানী হাভানায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। Ñতথ্যসূত্র : এপি, বিবিসি, আলজাজিরা
ক্যাস্ট্রোর শেষকৃত্য ৪ ডিসেম্বর ৯ দিনের শোক:
রাষ্ট্রীয় শোকের নবম দিন আগামী ৪ ডিসেম্বর সাম্যবাদী বিপ্লবী ফিদেল ক্যাস্ট্রোর শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে। কিউবার দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলীয় শহর সান্তিয়াগোতে চিরনিদ্রায় শায়িত হবেন বিপ্লবীদের নায়ক। এক বিবৃতিতে কিউবার সরকার জানিয়েছে, ২৬ নভেম্বর থেকে ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত জাতীয় শোক পালন করা হবে। আর ৪ ডিসেম্বর ক্যাস্ট্রোকে চিরবিদায় জানানো হবে। সারা দেশে চার দিনের শোক শোভাযাত্রা শেষে সান্তিয়াগো শহরে তার লাশ সমাহিত করা হবে বলে বিবৃতিতে জানানো হয়। সূত্র : ওয়েবসাইট।
ক্যাস্ট্রোর মৃত্যুতে বিশ্বনেতাদের শোক:
কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রোর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে বাণী দিয়েছেন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের বিশ্ব নেতৃবৃন্দ। তাকে আধুনিক বিশ্ব ইতিহাসের একটি যুগের প্রতীক হিসেবে আখ্যায়িত করে তার জীবনভর বিপ্লবের প্রশংসা করেছেন।
‘শক্তিশালী’ কিউবার জনক ক্যাস্ত্রো : গর্ভাচেভ
সাবেক সোভিয়েত নেতা মিখাইল গর্ভাচেভ গতকাল ফিদেল ক্যাস্ত্রোর প্রশংসা করেছেন। তিনি ক্যাস্ত্রোকে ‘শক্তিশালী’ কিউবার জনক বলে মন্তব্য করেন। স্থানীয় সময় গত শুক্রবার রাতে কিউবার সমাজতান্ত্রিক এই কিংবদন্তী নেতা মারা গেছেন। রুশ বার্তা সংস্থা ইন্টারফ্যাক্স গর্ভাচেভের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছে, ‘আমেরিকানদের কঠোর অবরোধ সত্ত্বেও ফিদেল তার দেশকে স্বাবলম্বী ও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করেন। ওই সময় তার ওপর ব্যাপক চাপ ছিল এবং সব ধরনের প্রতিকূলতা অতিক্রম করে তিনি তার দেশকে এগিয়ে নিয়ে যান। ক্যাস্ত্রো তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় কিউবাকে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যান।’
ক্যাস্ট্রো একটি যুগের প্রতীক : পুতিন
এদিকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন কিউবার সমাজতন্ত্রের নায়ক ৯০ বছর বয়সে মারা যাওয়া ফিদেল ক্যাস্ট্রোর প্রশংসা করে বলেছেন, তিনি ‘একটি যুগের প্রতীক’। ক্রেমলিনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে গতকাল একথা বলা হয়। কিউবার প্রেসিডেন্ট রাউল ক্যাস্ট্রোকে এক টেলিগ্রামে পুতিন বলেন, ‘এই প্রখ্যাত রাষ্ট্রনায়ক যথার্থই আধুনিক বিশ্ব ইতিহাসের একটি যুগের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হন।’ টেলিগ্রামের উদ্ধৃতি দিয়ে ক্রেমলিন বলেছেন, ‘ফিদেল ক্যাস্ট্রো রাশিয়ার একজন অকৃত্রিম ও নির্ভরযোগ্য বন্ধু ছিলেন।’
প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সনের শোক
কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং কমিউনিস্ট বিপ্লবের নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রোর মৃত্যুতে গভীর শোকপ্রকাশ করেছেন প্রেসিডেন্ট আব্দুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিএনপি চেয়ারপার্সন ও ২০ দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুসহ বাংলাদেশের নেতৃবৃন্দ। গতকাল পৃথক পৃথকভাবে তারা শোক বাণীতে এই নেতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান।
প্রেসিডেন্টের শোক
প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদ কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং কমিউনিস্ট বিপ্লবের নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রোর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। গতকাল এক শোক বার্তায় প্রেসিডেন্ট বলেন, ফিদেল ক্যাস্ট্রোর মৃত্যুতে বিশ্ব রাজনীতিতে যে শূন্যতা সৃষ্টি হবে তা কখনোই পূর্ণ হবে না। তিনি বলেন, বিশ্বে শোষিত মানুষের অধিকার পুনরুদ্ধারে তাঁর সংগ্রামী অবদান বিশ্বের মানুষ চিরকাল স্মরণ রাখবে। তিনি ক্যাস্ট্রোর বিদেহী আত্মার মুক্তি কামনা করেন এবং কিউবার জনগণ ও সরকারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
বাংলাদেশের জনগণ ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে : প্রধানমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রোর মৃত্যুতে গভীর শোকপ্রকাশ করেছেন। কিউবান এ নেতাকে বাংলাদেশের জনগণ ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। কিউবার প্রেসিডেন্ট রাউল ক্যাস্ট্রোর কাছে গতকাল পাঠানো এক শোকবাণীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, কিউবার নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রোর মৃত্যুতে আমি গভীরভাবে ব্যথিত। আমি বাংলাদেশের জনগণ ও সরকারের পক্ষ থেকে আপনার প্রতি এবং আপনার মাধ্যমে শোক-সন্তপ্ত পরিবার ও কিউবা প্রজাতন্ত্রের জনগণের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় সমর্থন ও অবদানের জন্য ফিদেল ক্যাস্ট্রোর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, মুক্তিযুদ্ধে অমূল্য অবদানের জন্য তাকে (ফিদেল ক্যাস্ট্রো) ‘বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা’য় ভূষিত করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, স্বাধীনতার পরে প্রথমদিকের বছরগুলোতে বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য এই মহান নেতা (ফিদেল ক্যাস্ট্রো) এবং কিউবার সরকার ও জনগণের সমর্থন ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ফিদেল ক্যাস্ট্রোর মধ্যকার মহান বন্ধুত্বকে স্মরণ করেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘তাঁরা ছিলেন মহান বন্ধু এবং ১৯৭৩ সালে আলজিয়ার্সে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের সম্মেলনে মি. ক্যাস্ট্রো আমার বাবাকে আলিঙ্গনের সময় একটি আবেগঘন মন্তব্য করেন, যা এখনও আমার মনে পড়ে।’ ফিদেল ক্যাস্ট্রো বলেছিলেন, ‘আমি হিমালয় দেখিনি। কিন্তু আমি শেখ মুজিবকে দেখেছি। ব্যক্তিত্ব ও সাহসে-এই মানুষটি হিমালয় সদৃশ। এভাবেই আমার হিমালয় দেখার অভিজ্ঞতা হয়েছে।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুই নেতার মধ্যে এই বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধই দ্বিপাক্ষিক, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে দুই দেশকে কাছাকাছি এনেছে। তিনি বলেন, ‘কিউবার এ নেতাকে বাংলাদেশের জনগণ ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে।’ ফিদেল ক্যাস্ট্রোর আত্মার শান্তি কামনা করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘তার চিরজীবী আত্মা পারলৌকিক শান্তি লাভ করুক।’
ক্যাস্ট্রো ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবেন : খালেদা
বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু কিউবার অবিসংবাদিত নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রোর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম  খালেদা জিয়া। গতকাল এক টুইটবার্তায় তিনি বিপ্লবী এ নেতার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেন। টুইটারে খালেদা জিয়া লেখেন, ‘মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু ও বিপ্লবী নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রো আর নেই, কিন্তু তিনি বিশ্ব ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবেন’।
ওবায়দুল কাদেরের শোক
সাধারণ সম্পাদক ও সড়ক যোগাযোগ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে শোক প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা মর্মাহত’। গতকাল রাজধানীর গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সম্মেলন উদ্বোধনের পর প্রধান অতিথির বক্তৃতায় ক্যাস্ট্রোর প্রতি এ শোক জানান তিনি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ক্যাস্ট্রোর গভীর বন্ধুত্ব ছিল উল্লেখ করে কাদের বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের অকুণ্ঠ সমর্থক ছিলেন ক্যাস্ট্রো। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার সমর্থন মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করেছিল। ১৯৭৩ সালে আলজিয়ার্সের এক সম্মেলনে তিনি বঙ্গবন্ধুকে হিমালয়ের সঙ্গেও তুলনা করেছিলেন। এমনকি বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র হচ্ছে জানিয়ে তাকে সতর্কও করে দিয়েছিলেন ক্যাস্ট্রো। তারপর তো ৭৫-এর সেই ভয়াবহ ঘটনাই ঘটে গেল। এ নেতার প্রতি গভীর শোক প্রকাশ করে তার আত্মার শান্তি কামনা করেছেন তিনি।
জাসদের শোক
কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট ও কমিউনিস্ট বিপ্লবের নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রোর মৃত্যুতে গভীর শোক জানিয়েছেন জাসদ সভাপতি তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু ও সাধারণ সম্পাদক শিরীন আক্তার এমপি। গতকাল এক যুক্ত বিবৃতিতে নেতৃদ্বয় বলেন, ফিদেল ক্যাস্ট্রোর মৃত্যুতে বিশ্ব একজন সত্যিকার নেতাকে হারালো। কমিউনিস্ট বিপ্লবে তাঁর কিংবদন্তী নেতৃত্ব সারাজীবন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
ন্যাপ ভাসানীর শোক
কিউবার বিপ্লবী নেতা বিশ্বের নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষের বন্ধু কমরেড ফিদেল ক্যাস্ট্রোর মৃত্যুতে ন্যাপ ভাসানীর চেয়ারম্যান এডভোকেট মোঃ আজহারুল ইসলাম এক বিবৃতিতে গভীর শোকপ্রকাশ করেছেন। বিবৃতিতে কিউবার শোক সন্তপ্ত মানুষ ও তার পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করা হয়। শোক বাণীতে তিনি বলেন, ফিদেল ক্যাস্ট্রোর মৃত্যুতে বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের নিপীড়িত মানুষ তাদের আজীবনের অকৃত্রিম বন্ধুকে হারালো। উল্লেখ্য, আফ্রো-এশিয়া ও ল্যাটিন আমেরিকার নির্যাতিত মানুষের আর এক নেতা মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর তিনি ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। ১৯৬৬ সালে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্তর্জাতিক সম্মেলনে তারা একসাথে অংশ গ্রহণ করেছিলেন।

নিউজটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2017-2019 AmarSurma.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: