রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬, ০৯:২১ অপরাহ্ন
মুহাম্মদ আব্দুল বাছির সরদার:
বড় স্বপ্ন নিয়ে লিবিয়া থেকে গ্রীস যাওয়ার পথে এ পর্যন্ত সুনামগঞ্জের ১২ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় চলছে নির্বাক পরিবারগুলোতে শোকের মাতম, স্তব্ধ হয়ে গেছে পুরো জেলা। সর্বত্রই চলছে বড় স্বপ্ন ইউরোপ যাওয়ার পথ ও দালালদের আটক করে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসার আলোচনা। বিষয়টি ‘টক অব দ্যা কান্টি’তে পরিণত হয়েছে।
পরিবার, বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম ও প্রশাসনিক সূত্রে জানা যায়, নিহতদের মধ্যে দিরাইয়ের ৬ জন, জগন্নাথপুরের ৫ জন, দোয়ারা বাজারের ১ জন। নিহতরা হলেন দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের তারপাশা গ্রামের আবু সর্দারের ছেলে মোঃ নুরুজ্জামান সর্দার ময়না (৩২), মৃত ক্বারী ইসলাম উদ্দীনের ছেলে মোঃ সাহান এহিয়া (২২), আব্দুল গণির ছেলে মোঃ সাজিদুর রহমান (২৬), রাজানগর ইউনিয়নের রনারচর গ্রামের মৃত আব্দুল মালেকের ছেলে মুজিবুর রহমান (৪০), করিমপুর ইউনিয়নের মাটিয়াপুর গ্রামের মোঃ আনোয়ার হোসেনের ছেলে মোঃ তারেক মিয়া (২৩), জগদল ইউনিয়নের বাসুরি গ্রামের ছালিক মিয়ার ছেলে মোঃ সুহানুর রহমান, জগন্নাথপুর উপজেলার চিলাউড়া গ্রামের সোহানুর রহমান, টিয়ারগাঁও গ্রামের শায়েক আহমেদ, চিলাউড়া কবিরপুর গ্রামের মোঃ নাঈম আহমদ, পাইলগাঁও গ্রামের মোঃ আমিনুর রহমান, ইছগাঁও গ্রামের মোহাম্মদ আলী ও দোয়ারাবাজার উপজেলার কবিরনগর গ্রামের ফয়েজ উদ্দিনের ছেলে ফাহিম আহমেদ মুন্না (২০)। মারা যাওয়ার পর তাদের মরদেহ সাগরে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, গত ২১ মার্চ সন্ধ্যায় লিবিয়ার তোবরুক অঞ্চল থেকে মোট ৪৮ জন যাত্রী রাবারের (বাতাস) নৌকায় গ্রিসের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। যাত্রাপথে নৌকাটি দিক হারিয়ে ছয় দিন ধরে সাগরে ভেসে ছিল। এই সময় যাত্রীরা তীব্র খাবার ও পানির সংকটে পড়েন। গ্রিস কোস্টগার্ড জানিয়েছে, ইয়েরাপেত্রা উপকূল থেকে প্রায় ৫২ নটিক্যাল মাইল দক্ষিণে একটি বিপদগ্রস্ত নৌকার খবর পেয়ে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হয়। পরে একটি ফ্রন্টেক্স জাহাজ ঘটনাস্থলে পৌঁছে ২৬ জনকে জীবিত উদ্ধার করে। উদ্ধার হওয়া ২৬ জনের মধ্যে ২৪ জন পুরুষ, একজন নারী ও একজন নাবালক রয়েছেন। তাদের প্রথমে কালা লিমেনা বন্দরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরবর্তীতে হেরাকলিয়ন বন্দরে স্থানান্তর করা হয়। অসুস্থ দুইজনকে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
নিহতদের স্বজনদের অভিযোগ, তারাপাশা গ্রামের ওয়াকিব মিয়ার ছেলে মুজিবুর রহমান নামের এক মানব পাচারকারীর সঙ্গে জনপ্রতি প্রায় ১২ লাখ টাকায় চুক্তি করে তারা লিবিয়া হয়ে গ্রিস যাওয়ার উদ্যোগ নেন। চুক্তি অনুযায়ী বড় ও নিরাপদ নৌযানে পাঠানোর কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তাদের ছোট ও ঝুঁকিপূর্ণ নৌকায় তুলে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। নিহতদের পরিবারগুলোর আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে গ্রামাঞ্চল। দ্রুত মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি জড়িত মানবপাচার চক্রের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এই মর্মান্তিক ঘটনায় সুনামগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। একই সঙ্গে অবৈধভাবে ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় দালাল চক্রের মাধ্যমে গত রমজানে লিবিয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি ছাড়েন তারাপাশা গ্রামের ৪ যুবক। এরমধ্যে লিবিয়া থেকে নৌকাযোগে গ্রিস যাওয়ার পথে দুর্ঘটনায় তাদের তিনজনের মৃত্যু হয়। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের বরাতে জানা যায়, যাত্রাপথে খাদ্য ও পানির সংকট চরমে পৌঁছালে অনেকেই দুর্বল হয়ে পড়েন এবং পর্যায়ক্রমে মারা যান। পরে পাচারকারীদের নির্দেশে মৃতদেহগুলো ভূমধ্যসাগরে ফেলে দেওয়া হয়।
জগন্নাথপুর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. বরকত উল্লাহ জানিয়েছেন, জগন্নাথপুরের ৫ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হয়েছে। দিরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সন্জিব সরকার বলেন, নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে যোগাযোগ করেন নি। স্থানীয়ভাবে এ ধরণের খবর পাওয়া গেলেও বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ প্রসঙ্গে সুনামগঞ্জে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুজন সরকার বলেন, ভূমধ্যসাগরে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলার ১০ জন রয়েছেন বলে আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পেরেছি। তাঁদের নাম-পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা চলছে। জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া জানান, নিহতরা বৈধ পথে বিদেশে যাননি। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হবে।