শনিবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:১৬ অপরাহ্ন
আমার সুরমা ডটকম:
স্বপ্নের ইউরোপ গিয়ে জীবনকে রঙিন করতে দালালদের হাত ধরে পাড়ি জমান তারা। কিন্তু সাগর পথে লিবিয়া থেকে বড় বোটে গ্রিস যাওয়ার কথা থাকলেও দালালরা টাকা বাঁচাতে অপেক্ষাকৃত ছোট বোটে (নৌকা) তুলে দেয়া হয় তাদেরকে। দীর্ঘ যাত্রায় পথ হারিয়ে এবং সাথে থাকা বিশুদ্ধ পানি ও খাবার শেষ হয়ে গেলে এক সময় মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে সাগরেই শেষ ঠিকানা হয় তাদের। হতভাগা এসব যুবকদের করুণ এ পরিণতির কথা বেঁচে যাওয়া একজন সহযাত্রী জানিয়েছেন। তিনি আরো বলেছেন, তাদের লাশ প্রথমে বোটেই ছিল, কিন্তু মারা যাওয়ার কয়েকদিন হওয়ায় গন্ধ বের হলে দালালদের চাপেই লাশগুলোকে শেষমেশ সাগরে ভাসিয়ে দেয়া হয়। এতে লিবিয়া থেকে অবৈধভাবে গ্রিস যাওয়ার পথে সাগরে নৌকা দুর্ঘটনায় ২২ জন অভিবাসন প্রত্যাশীর মৃত্যু ঘটে। তাদের মধ্যে ১৮ জনই বাংলাদেশি, এরমধ্যে সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত সুনামগঞ্জের রয়েছেন ১৫ জন। মর্মান্তিক এ ঘটনাটি গত ২৮ মার্চ শনিবার ভূমধ্যসাগরে ঘটে।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, গত ২১ মার্চ সন্ধ্যায় লিবিয়ার তোবরুক অঞ্চল থেকে মোট ৪৮ জন যাত্রী রাবারের (বাতাস) নৌকায় গ্রিসের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। যাত্রাপথে নৌকাটি দিক হারিয়ে ছয় দিন ধরে সাগরে ভেসে ছিল। এই সময় যাত্রীরা তীব্র খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে পড়েন। গ্রিস কোস্টগার্ড জানিয়েছে, ইয়েরাপেত্রা উপকূল থেকে প্রায় ৫২ নটিক্যাল মাইল দক্ষিণে একটি বিপদগ্রস্ত নৌকার খবর পেয়ে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হয়। পরে একটি ফ্রন্টেক্স জাহাজ ঘটনাস্থলে পৌঁছে ২৬ জনকে জীবিত উদ্ধার করে। উদ্ধার হওয়া ২৬ জনের মধ্যে ২৪ জন পুরুষ, একজন নারী ও একজন নাবালক রয়েছেন। তাদের প্রথমে কালা লিমেনা বন্দরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরবর্তীতে হেরাকলিয়ন বন্দরে স্থানান্তর করা হয়। অসুস্থ দুইজনকে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত জেলার জগন্নাথপুর ও দিরাই থানায় ৯ জন দালালকে আসামী করে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে দুইটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত ৩০ মার্চ সোমবার রাতে দিরাই উপজেলার বাসুরি গ্রামের নিহত সুহানুর রহমানের বাবা ছালিকুর রহমান ৪ দালালের বিরুদ্ধে বাদী হয়ে দিরাই থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। এছাড়া ৩১ মার্চ মঙ্গলবার জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার পাইলগাঁও ইউনিয়নের পাইলগাঁও গ্রামের নিহত আমিনুর রহমানের বাবা হাবিবুর রহমান বাদি হয়ে ৫ দালালের বিরুদ্ধে থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলার আসামিরা হলেন ছাতক থানার গয়াসপুর গ্রামের মদরিছ মিয়ার ছেলে দুলাল মিয়া, জগন্নাথপুর উপজেলার ইছগাঁও গ্রামের মৃত মন্তাজ মিয়ার ছেলে আজিজুল ইসলাম। এছাড়াও আসামিরা হলেন বিলাল মিয়া, জসিম মিয়া, এনাম মিয়া।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলো দালাল মুজিবুর রহমান ও ইতালি প্রবাসী সালেহ আহমদসহ চক্রের সদস্যদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছে। স্বজনদের অভিযোগ, বড় নৌকায় নিরাপদে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে দালালরা জনপ্রতি ১২ থেকে ১৩ লাখ টাকা হাতিয়ে নিলেও শেষ পর্যন্ত তাদের সন্তানদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে। এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসার পাশাপাশি স্থানীয় সচেতন মহল এই অবৈধ মানবপাচার বন্ধে প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
নিহতদের মধ্যে দিরাই উপজেলার ৭ জন, দোয়ারাবাজার উপজেলার ১ জন, ছাতকের ১ জন ও জগন্নাথপুর উপজেলার ৬ জন রয়েছেন।
প্রথম ধাপে পাওয়া সংবাদে নিহতরা হলেন দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের তারাপাশা গ্রামের আবু সরদারের ছেলে মোঃ নুরুজ্জামান সরদার ময়না (৩০), আবদুল গণির ছেলে সাজিদুর রহমান (২৮), ইসলাম উদ্দিনের ছেলে সাহান এহিয়া (২৫), রাজানগর ইউনিয়নের রনারচর গ্রামের আবদুল মালেকের ছেলে মুজিবুর রহমান (৩৮), করিমপুর ইউনিয়নের মাটিয়াপুর গ্রামের তায়েফ মিয়া (২৪) ও বাসুরি গ্রামের সুহানুর রহমান এহিয়া (২২), দোয়ারা বাজার উপজেলার কবিরনগর গ্রামের ফয়েজ উদ্দিনের ছেলে আবু ফাহিম (২০), জগন্নাথপুর উপজেলার চিলাউড়া গ্রামের সোহানুর রহমান, টিয়ারগাঁও গ্রামের আশিক মিয়ার ছেলে শায়েক আহমেদ (২০), চিলাউড়া কবিরপুর গ্রামের দুলন মিয়ার ছেলে মোঃ নাঈম আহমদ (২৪), পাইলগাঁও গ্রামের হাবিবুর রহমানের ছেলে আমিনুর রহমান (৩৫) এবং ইছগাঁও গ্রামের বশির মিয়ার ছেলে মোহাম্মদ আলী (২৩)। পরবর্তীতে আরো ৩ জন মারা যাওয়ার খবর পাওয়া যায়। তারা হলেন দিরাই উপজেলার হালায়া (রাজনগর) গ্রামের মোঃ আরজু মিয়ার ছেলে মোঃ আব্দুল্লাহ মিয়া, ছাতক উপজেলার ভাতগাঁও ইউনিয়নের গাগলাজুর গ্রামের নুরুল আমিনের ছেলে মুহিবুর রহমান, জগন্নাথপুর উপজেলার চিলাউড়া-হলদিপুর ইউনিয়নের চিলাউড়া গ্রামের মোঃ সামছুল হকের ছেলে মোঃ ইজাজুল ইসলাম রেজা (২২)।
সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) সুজন সরকার জানান, এ ঘটনায় ৯ জন দালালের নাম উল্লেখ এবং আরো কয়েকজনকে অজ্ঞাত আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে তাদের নাম আপাতত প্রকাশ করা হচ্ছে না। আসামিদের ধরতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ২৮ মার্চ শনিবার লিবিয়া থেকে অবৈধভাবে গ্রিসে যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবির ঘটনায় অন্তত ২২ জন অভিবাসন প্রত্যাশীর মৃত্যু ঘটে। নিহতদের মধ্যে ১৮ জনই বাংলাদেশি। তাদের মধ্যে সুনামগঞ্জ জেলার চার উপজেলার ১৫ জন রয়েছেন। এরমধ্যে জগন্নাথপুর উপজেলার ৬, দিরাই উপজেলার ৭ জন, দোয়ারা বাজার উপজেলার ১ জন ও ছাতক উপজেলার ১ জন। জানা গেছে, জনপ্রতি প্রায় ১২ লাখ টাকায় চুক্তি করে তারা লিবিয়া হয়ে গ্রিস যাওয়ার উদ্যোগ নেন। চুক্তি অনুযায়ী নিরাপদ ও বড় নৌযানে নেওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তাদের ছোট ও ঝুঁকিপূর্ণ নৌকায় তুলে দেওয়া হয়, যা এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।