মঙ্গলবার, ০৭ Jul ২০২৬, ০৬:২১ অপরাহ্ন
আমার সুরমা ডটকম:
সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে গ্রাম্য পঞ্চায়েতি বিচারের নামে বহু পরিবারকে এক ঘরে করে রাখা, মারধর, বাড়িঘর লুটপাট, নারী-পুরুষ ও শিশুদের নিরাপত্তাহীনতাসহ রাষ্ট্রীয় আইন বিরোধী কার্যক্রম নির্বিঘ্নে চালিয়ে যাচ্ছে সমাজের একটি শ্রেণির মানুষ। এসব লোক পঞ্চায়েতের দোহাই দিয়ে গ্রাম্য প্রতিপত্তি ও আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে প্রতিপক্ষের লোকজনকে বাড়ি ছাড়া, বাড়ি ঘর লুটপাট করা, নির্যাতনসহ নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে নারী-পুরুষ ও শিশুরা। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের একাধিক গ্রামে ঘটেছে এ ঘটনা।
সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জেলার ভাটিপাড়া ইউনিয়নের ছাতলপাড় গ্রামে একটি চক্র জমিজমার দোহাই দিয়ে নিজেদের স্বার্থ আদায় করতে না পেরে অবশেষে গ্রাম্য পঞ্চায়েতের নামে মৃত ছফা মিয়ার পাঁচ ছেলের পরিবারকে এক ঘরে করে রেখে মানসিক নির্যাতন, দোকানে আগুন দেয়া ও মালামাল লুটপাট করাসহ বিভিন্ন উপায়ে হেনস্থা করে আসছে। তাদের এই অপকর্ম থেকে বাঁচতে অবশেষে বাধ্য হয়েই প্রায় দুই বছর যাবত পরিবারের সবাই বাড়ি ছাড়া রয়েছেন। তারা হলেন গ্রামের মৃত ছফা মিয়ার ছেলে নূর মিয়া, আবুল ফজল, মাওলানা আবুল কাসেম, আতাউর রহমান, শফিকুর রহমান ও তাদের পরিবারের সকল সদস্য। এ পরিবার ছাড়াও আরো অনেক পরিবার একই কায়দায় মানসিক নির্যাতনের ভয়ে বাড়ি ছাড়া রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রের দাবি। এ নিয়ে একাধিবার দিরাই থানায় অভিযোগ দায়ের করা হলেও স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন একটি বিশেষ মহলের ইশারায় সেই অভিযোগগুলো তদন্ত করছে না। ফলে অপরাধীরা আরো বেপরোয়া আচরণ করে থাকে।
সূত্র মতে, চলতি বছরের ২৪ মার্চ চাতলপাড় গ্রামের মৃত ছফা মিয়ার ছেলে আবুল ফজল বাদী হয়ে একই গ্রামের তারিফ আলী, জইন উদ্দিন, মনির মিয়া, নবাব খান, এহিয়া খান, সুলেমান খান, সুতারগাঁও গ্রামের শিশি মোহন দাসসহ অজ্ঞাত ১৫/২০ জনকে বিবাদী করে দুই লক্ষ ৩২ হাজার টাকার মালামাল লুটপাটের একটি অভিযোগ দায়ের করলেও প্রভাবশালী একটি মহলের ইঙ্গিতে ও প্রচুর অর্থের বিনিময়ে তা আমলে নেয়া হয়নি। সূত্র আরো জানায়, এসব লুটপাটকৃত মালামাল বিবাদীদের ঘরে রক্ষিত আছে মর্মে কিছুদিন আগে পুলিশ দেখে আসে। এরপরও এসব লুণ্ঠিত মালামাল উদ্ধারে কোনো পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ বাদীপক্ষের। তাদের প্রশ্ন, কোন অদৃশ্য ইশারায় স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন এই অভিযোগের কদন্ত ও মালামাল উদ্ধারে গড়িমসি করছে?
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, গত বিবাদীগণ অত্যন্ত উগ্র, দাঙ্গাবাজ, জবর দখলকারী, লাঠিয়াল ও সন্ত্রাসী প্রকৃতির লোক। তাদের সাথে আমাদের জায়গা-জমি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মনোমালিন্য, মামলা ও বিরোধ চলে আসছে। এরই জের ধরে তারা রাতের আঁধারে আমাদের দোকানে হামলা করে মালামাল লুট করে এবং আগুন ধরিয়ে দেয়। আমাদেরকে নিয়মিতভাবে মানসিক চাপে রাখার চেষ্টার অংশ হিসেবে গরু-বাছুর মাঠে যেতে দিতো না। নানাভাবে তারা উৎপাত করতো। পরিবারের প্রধান হিসেবে আমরা বিভিন্ন পেশায় থাকায় বাড়ির নারী-শিশুরা সব সময় আতঙ্কে থাকতেন। প্রতিনিয়ত আমাদের পরিবারের লোকজনের জানমালের ক্ষতি করার চেষ্টা তারা করতো। আমরা যখন নিরাপত্তাহীনতায় থেকে প্রশাসনের আশ্রয় চেয়েও ব্যর্থ হচ্ছিলাম, তখন অবশেষে তাদের চাপ সহ্য করতে না পেরে আমরা অন্যত্র চলে যাই। এই সুযোগে বিবাদীগণ আমাদের ঘর লুটপাট করে সমস্ত মালামাল নিয়ে যায়। আমাদের বার বার আবেদন ও অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অবশেষে কিছুদিন আগে একজন এসআই গিয়ে বিবাদীদের বাড়ি-ঘরে লুটপাটকৃত মালামাল দেখতে পান। উদ্ধারের আশ্বাস দেয়ার পরও এখন পর্যন্ত লুণ্ঠিত কোনো মালামাল উদ্ধার করেনি স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন।
ভূক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, জায়গা-জমি সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে তারা নির্যাতন, হয়রানি ও প্রাণনাশের হুমকির শিকার হয়ে আসছেন। এক পর্যায়ে তাদের বসতবাড়িতে হামলা ও লুটপাটের ঘটনাও ঘটে বলে দাবি করেন তারা। এতে চরম নিরাপত্তাহীনতার মুখে পরিবারসহ নিজ বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। স্থানীয় প্রশাসনকে এ বিষয়টি অবহিত করা হলেও নানা চাপে নিশ্চুপ তারা।
জানা যায়, পরিবারটির সদস্য মাওলানা আবুল কাসেম এলাকায় একজন সম্মানিত ও সুপরিচিত ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। পরিবারের দাবি, তিনিও একইভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ভূক্তভোগী পরিবার ঘটনার নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তাদের নিরাপদে নিজ বাড়িতে ফিরে বসবাসের পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
জানতে চাইলে দিরাই থানার নবাগত অফিসার ইন-চার্জ (ওসি) আমিনুল ইসলাম জানান, গ্রাম্য পঞ্চায়েতের আইন কিছুটা হলেও রাষ্ট্রের আইনের সাথে সাংঘর্ষিক। আমি যেহেতু নতুন আসছি, এ ব্যাপারে ভালো করে খোঁজ নিয়ে সমস্যাগুলোর সঠিক সমাধানের চেষ্টা করবো।